অনুপ্রেরণার প্রতিক সেই শাকিলের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন হলো পূরণ !

আলাউল হোসেন : কোনো কাজই ছোট নয়। আমাদের যে কোনো কাজকে বড় করে দেখার মানসিকতা নেই- এটাই আমাদের বেকারত্ব সমস্যার অন্যতম কারণ, এটাই আমাদের দীনতার একমাত্র কারণ। রসায়ন শাস্ত্রে অনার্সসহ মাস্টার্স সম্পন্ন করা তৌহিদুল ইসলাম শাকিল এমনটাই মনে করেন। তাই তো তিনি লেখাপড়া শেষ করে একদিনও বেকার না থেকে বাবার চায়ের দোকানে কাজ করেন; চা বানিয়ে নিজেই পরিবেশন করে থাকেন। চায়ের দোকানদারীর পাশাপাশি তিনি টিউশনীও করেন। শিক্ষক হবার স্বপ্ন নিয়ে নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। এভাবেই এনটিআরসিএ কর্তৃক শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হন শাকিল।

২০২০ সালে যখন তাকে নিয়ে প্রতিবেদন করা হয়, তখন তাকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেছিলেন, স্কুল-কলেজে শিক্ষকতা করার স্বপ্ন নিয়েই আমি আমার সাধ্যমতো পড়াশুনা করছি, প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি- চাকরি আমার একদিন হবেই। কিন্ত চাকরি না হওয়া পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যও অলস সময় কাটাতে চাই না। তাই সকাল-বিকেলে বাবার চায়ের দোকানে কাজ করি।

পাবনার বেড়া উপজেলার মাশুমদিয়া কলেজ বাজারে চায়ের দোকান রয়েছে তৌহিদুল ইসলাম শাকিলের বাবার। তার বাবা মজিদ মোল্লা একসময় পরিবহন শ্রমিকের কাজ করতেন। প্রায় ১৩ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন তিনি। সংসার চালাতে তিনি কলেজ বাজারে ছোট একটি চায়ের দোকান দেন। শাকিল তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। ওই সময় থেকেই তিনি বাবাকে চায়ের দোকান চালাতে সাহায্য করে আসছিলেন। এক দিকে বাবার সঙ্গে চায়ের দোকান চালানো, অন্যদিকে পড়াশোনা। এভাবেই তিনি বিজ্ঞান বিভাগে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর রসায়ন শাস্ত্রে বিএসসি সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হন পাবনার সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে। সেখানে পড়াশোনা করার ফাঁকে বাবার সঙ্গে চায়ের দোকানটি তিনি চালিয়ে গেছেন। অনার্স পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার পর শাকিল চায়ের দোকানে কাজের সময় আরও বাড়িয়ে দেন। পাশাপাশি তিনি টিউশনীও করেন। আর টিউশনী করতে গিয়েই তিনি শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন।

গতকাল (১৫ জুলাই) রাতে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) বাংলাদেশে বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগের ফল প্রকাশ করে। ওই ফলাফল অনুযায়ী- শাকিল বেড়া উপজেলার আমিনপুর আয়েনউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে ভৌতবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তার এই নিয়োগপ্রাপ্তির খবর জানাজানি হলে রাতেই স্থানীদের কমেন্টে প্রশংসিত হন শাকিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শাকিলকে নিয়ে পাঁচ শতাধিক মানুষের অভিনন্দন বার্তায় শাকিল উচ্ছ্বসিত।

মনে কতটুকু জোর থাকলে স্পষ্টভাষায় বলা যায়, শিক্ষক তো আমি একদিন হবোই- কিন্তু চাকরী না হওয়া পর্যন্ত বেকারসময় কাটাতে চাই না একদিনও; তাই চায়ের দোকানে কাজ করছি।

শাকিল বলেন, একসময় কেউ কেউ আমার চা বানিয়ে বিক্রি করার বিষয়টি বাঁকা চোখে দেখতেন। কিন্তু এখন অনেকেই বাহবা দেন। একদিকে আমি টিউশনী করেছি, অন্যদিকে চায়ের দোকানটিও চালিয়েছি। আমার কাছে দুটি কাজই সম্মানজনক। এখন স্কুলে স্থায়ী চাকরির সুযোগ পেলাম- এটিই হবে আমার একমাত্র পেশা। তার মতে, কাজ না করে বেকার বসে থাকাটা শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার জন্যই অসম্মানের।

চায়ের দোকানে শাকিল তার বাবাকে সহায়তা করছেন

আমিনপুর থানার প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের কাছে শাকিল এখন অনুপ্রেরণার প্রতিক। শাকিলরা তিন ভাই-বোন। অন্য দুই ভাই-বোনও পাবনার সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন।

শাকিলের দোকানে নিয়মিত চা পান করতে আসেন মাশুমদিয়া ভবানীপুর কে.জে.বি ডিগ্রি কলেজের কয়েকজন শিক্ষক। তারা বলেন, শাকিল সব ধরনের সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠা অসম্ভব পরিশ্রমী এক তরুণ। কোনো কাজই যে ছোট নয়, তা তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন। শিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকার তরুণদের জন্য তিনি অবশ্যই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

কিছু সময়ের জন্য হলেও শাকিল কাজকে ভালোবেসে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন, তা যেন এলাকার শিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকার-যুবকদের জন্য অনুকরণীয়-অনুসরণীয় হয়ে থাকলো। জয় হোক শাকিলের।

Related Articles

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Next News BD Powered By : Code Next IT