বেড়া-সাঁথিয়ায় ভয়নাক মোবাইল গেমসে আসক্ত শিক্ষার্থীরা

আরিফ খাঁন, বেড়া, পাবনাঃ বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে প্রায় দের বছর থেকে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।

সে সুবাদে পাবনা বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলার স্কুল-কলেজের অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা দিনরাতের বেশীর ভাগ সময় মুঠোফোনে ভিডিও গেমসে আসক্ত হয়ে পরেছে।
অনলাইন ক্লাসের অযুহাতে অসচ্ছল পরিবারের সন্তানরাও অনেক দামী দামী এন্ড্রয়েট ফোন কিনছে।

সরেজমিনে বেড়া-সাঁথিয়ার বিভিন্ন গ্রামে পাড়া মহল্লায় ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার মোড়ে, গাছের নিচে, খোলা কোন জায়গায়, স্কুল মঠে, জুটিবেধে বসে ফোর্টনাইট, তিন পাত্তি, লুডু, জান্ডীমুন্ডা ফ্রী ফায়ার-পাবজি গেমসগুলো খেলছে।

যে স্থানে ওয়াইফাই নেট কানেকশন আছে সেখানে জটলা বেধে ৩০- ৪০ জনকেও একসাথে বসে গেম খেলতে দেখো যায়। ওয়াইফাই এর মাসিক বিল ১০০ থেকে ১৫০ টাকা মোবাইল প্রতি দিতে হয় বলে তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে।

এদের মধ্যে অধিকাংশরাই মোবাইলে অর্থের বিনিময়ে জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। ইদানিং লক্ষ করা যাচ্ছে শিশু কিশোররাও গেমস খেলার প্রতি আসক্ত হচ্ছে। যাদের মোবাইল নেই তারা বড়দের পিছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছেন এবং চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে তাদেরকে আবার পরামর্শ দিতেও দেখা যায় ‘ভাই মারেন এদিকে যান ও দিকে যান এরকম আরকি’।

এদের মধ্যে বেশীর ভাগই ফ্রি ফায়ার ও পাবজি নামক গেমসের নেশায় বেশী জড়িয়ে পড়ছে। এই গেমস খেলায় যারা বেশি পারদর্শী তারা আবার ডায়মন্ট বিক্রির ব্যাবসা করছে। অনেকে আবার ফ্রী ফায়ার ও পাবজী গেমস খেলে অতিরিক্ত লেভেল পার করে সেই ফেসবুক আইডি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকাও দাম হাকায় কিনছেও অনেকেই।

এমনও দেখো গেছে রাস্তাদিয়ে হাটার সময়ও শিক্ষার্থীদের এই গেম খেলা নিয়ে আলোচনা করে। এক কথায় তাদের মাথার মধ্যে এই গেম ছাড়া আর কিছুই নেই। অবাক করা বিষয় হল গেমস খেলার জন্য আঙ্গুলে লাগানোর মুজাও বেড় হয়েছে। এই মুজা পড়ে খেললে আঙ্গুল দ্রুত নাড়ানো যায় বলে কজনের সাথে কথা বলে জানা যায়।

এ বিষয়ে আলাপকালে কয়েকজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে নিউজ পাবনার প্রতিবেদককে জানান, ‘এখন শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু বিগত সময় গুলোতে তারা বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণ ও খেলার মাঠে ক্রীড়া চর্চার মধ্যে ব্যস্ত থাকতো এটাই চলমান ছিল।

বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা ক্ষেত্রে ডিজিটাল ও তথ্য প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। অথচ তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে শিক্ষার্থীরা জড়িয়ে পড়ছে গেমসের নেশায়। উঠতি বয়সের তরুণ প্রজন্ম প্রতিনিয়ত এন্ড্রয়েড ফোন দিয়ে এসব গেইমে আসক্ত হচ্ছে। এসব বিদেশী গেম থেকে নিজেদের ছেলেমেয়েকে ফিরিয়ে আনতে না পারলে বড় ধরণের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা জানান।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, ‘ফ্রি ফায়ার গেমস প্রথমে তাদের কাছে ভালো লাগত না। কিছুদিন বন্ধুদের খেলা দেখা দেখিতে তারা আসক্ত হয়ে গেছে। এখন গেমস না খেলে তাদের অস্বস্তিকর মনে হয়।’

এ বিষয়ে সাঁথিয়া সোয়াইব ক্যাবল নেটওয়ার্ক এর পরিচালক কাবিল হোসেন (ছোট) বলেন, এক বছরে আমার ইন্টারনেট সংযোগ বেড়েছে কয়েকগুন। বছরখানেক আগে হাতেগোনা কয়জন নেট কানেকশন নিত আর এখন প্রতিটি পাড়ায় ও ঘরে ঘরে সংযোগ দিতে হচ্ছে। নেট সংযোগ দিতেই নাকি সে হিমসিম খাচ্ছে বলে জানান।

সাঁথিয়া উপজেলার পুন্ডুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু হানিফ খান বলেন, ‘অনলাইন ক্লাসের অযুহাতে অসচ্ছল পরিবারের সন্তানরাও অনেক দামী ফোন কিনছে। ছেলে-মেয়ে শিক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করে অভিভাবকরাও ধার-দেনা করে ফোন কেনার টাকা যোগান দিচ্ছেন। অথচ অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা পরিবারের মোটা অংকের অর্থ খরচ করে ‘ডায়মন্ড ও ইউসি’ কিনছে।

অনেকেই টাকা যোগান দিতে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপকর্মে। কোমলমতি শিশুরা যেখানে টাকা জমিয়ে ক্রিকেট বল, ফুটবল কেনার কথা, সেখানে তারা টাকা জমিয়ে রাখছে ইউসি অথবা ডায়মন্ড কেনার জন্য।’ এখন বিকেল হলে ছেলেদের স্কুল মাঠে খেলতেও দেখা যায় না।

বেড়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ ( ওসি) অরবিন্দ সরকার বলেন, শিক্ষারর্থীদের ভয়ানক এই গেমস নেশা থেকে ফিরিয়ে আনতে হলে অভিভাবকদের সচেতন হওয়াটা খুব জরুরি।

গেমস খেলতে যে ইন্টারনেট এমবি প্রয়োজন হয় সেটা কিনতেতো টাকা লাগে সে টাকাতো অভিভাবকদের থেকেই নিচ্ছে। বেড়া থানা পুলিশের নজরে গেমস খেলতে দেখা শিক্ষারর্থীদের সবসময়ই সচেতন করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

এ বিষয়ে বেড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সবুর আলী বলেন, ‘শীক্ষার্থীদের ভয়াবহ এই মোবাইল গেমসের নেশা থেকে সরিয়ে আনতে হলে প্রথমে অভিভাকদের সচেতন হতে হবে। এছাড়াও এলাকার মুরব্বি জনপ্রতিনিধি সবাইকে সচেতন হতে হবে।
মসজিদের ইমাম মসজিদে এ ভয়ানক গেমস খেলা থেকে বিরত রাখার বিষয়ে আলোচনা করতে পারে। তাছাড়া আমি এই বিষয়ে উপজেলার সকল শিক্ষককে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সময় এই ধরনের সচেতনতার মেসেজটা শিক্ষার্থীদের পৌছে দেয়ার কথা বলে দিব।

Related Articles

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।